Thursday, 25 December 2014

বাংলার মন্দির গাত্রে টেরাকোটার কৌণিক ভাস্কর্য

বাংলার শেষ মধ্যযুগের মন্দির অলঙ্করণে রামায়ন -মহাভারত - পুরাণ -মঙ্গলকাব্যের বা কৃষ্ণলীলার আধিক্য বা তৎকালীন সমাজের চালচিত্র  - বেশভূষা অথবা অবসর বিনোদনের উপস্থিতি সার্বজনীন এবং বহুল প্রচলিত।  কিন্তু বাংলার মন্দির গাত্রে কৌণিক ভাস্কর্য হল 'Terracotta' র আর একটি উৎকৃষ্ট প্রতিকী নিদর্শন, যা দেখে কৌতুহলের উদ্রেক হয়।  যদিও বিস্তারিত সাহিত্য পর্যালোচনা করে এই বিশেষ প্রতিকী নিদর্শন সন্মন্ধীয় বিশেষ তথ্য পাওয়া যায়নি।  তবে প্রয়াত তারাপদ সাঁতরা মহাশয় এই বিষয়ে কিছুটা আলোকপাত করেছেন।  তিনি অবশ্য নিজে স্বীকার করে  নিয়েছেন যে এই বিশেষ প্রতিকী নিদর্শন সন্মন্ধে বিস্তারিত অনুসন্ধান প্রয়োজন।

বাংলার মন্দিরে এই কৌণিক ভাস্কর্য সন্মন্ধে আলোচনা করতে গেলে প্রথমে বাংলার রথের উল্লেখ করতে হয়। রথের কোণে কোণে কাঠের খুটির উপর মানুষ ও জন্তু-জানোয়ারের  উল্লম্ব ভাবে যে ভাস্কর্য করা হয় তাকে  শিল্পীদের ভাষায় 'বর্শা' বলা হয়।  রথের এই কৌণিক ভাস্কর্যের অনুসরণ, বাংলার কিছু কিছু মন্দির সজ্জাতেও দেখা যায়।  রথের আদলেই Terracotta অলঙ্করণ যুক্ত এই স্তম্ভগুলি মন্দিরের চাল থেকে পাদমূল পর্যন্ত প্রতিটি কোণে কোণে স্থাপিত হযেছে। স্তম্ভগুলি মূলত আয়াত আকৃতির। যদিও বীরভূমের (উদাহরণ: ইলাম বাজার) কিছু কিছু মন্দিরে  ত্রিভুজ আকৃতির অভিক্ষেপের নিদর্শন পাওয়া যায়। প্রধানত বাংলার রত্ন মন্দিরগুলিতেই এই স্থাপত্যরীতির অনুসরণ হযেছে। উদাহরণ স্বরূপ বর্ধমান জেলার অম্বিকা কালনার পঁচিশ-রত্ন বিশিষ্ট গোপালজীর মন্দির, লালজীর মন্দির বা কৃষ্ণচন্দ্রের মন্দিরের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। এছাড়াও হুগলি, বীরভূম বা মেদিনীপুর জেলার কিছু মন্দিরে এই ধরণের কৌণিক ভাস্কর্য লক্ষ্য করা যায়। তবে শুধু যে রত্ন মন্দির গুলিতেই এই ধরনের কৌণিক ভাস্কর্য অনুসৃত হযেছে তা নয়, রত্ন মন্দির ছাড়াও বাংলার আটচালা রীতির মন্দিরেও এই প্রতিকী সজ্জা ব্যবহৃত হযেছে
- যার উৎকৃষ্ট উদাহরণ হল হুগলি জেলার আঁটপুরের রাধাগোবিন্দজীউর মন্দির।

মন্দিরের বহিরাঙ্গ সজ্জায় এই কৌনিক ভাস্কর্যে যে অলংকরণ ব্যবহৃত হযেছে তার বিষয় বস্তুগুলি কিছুটা অদ্ভূত প্রকৃতির বলে তারাপদ সাঁতরা মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন যে কোনো কোনো গবেষকদের মতে এগুলি হল 'সংহার শৃঙ্খল' motif যার মধ্যে শিব সেনা ও কালী সেনার যুদ্ধ দেখানো হযেছে, আর অন্য গবেষকদের মতে এগুলি হল 'মৃত্যুলতা' বা 'Chain of Death' । তিনি আরো উল্লেখ করেছেন যে "মনে হয়, আল্পনার অলংকরণের পত্রলতা, পদ্মলতা বা শঙ্খলতার মতই নামকরণ করা হযেছে মৃত্যুলতা।" এই মৃত্যুলতায় প্রধানত বর্শা হাতে শিকাররত বা যুদ্ধরত অশ্বারোহীর সঙ্গে সঙ্গে  একে অপরকে সংহাররত অবস্থায় বিভিন্ন জন্তু জানওয়ার একত্রে উল্লম্ব ভাবে বিস্তৃত।  ফুল বা লতা পাতার আধিক্য এই লতায় নেই। জন্তু জানওয়ারের মধ্যে বাঘ, সিংহ, ঘোড়া, হাতি, হরিণ, মহিষ ইত্যাদির প্রাধান্য দেখা গেলেও এই লতায় বাঘ-ঘোড়া, বা সিংহ- ঘোড়া অথবা অন্য কোনো প্রাণীর সংমিশ্রণে তৈরী কিছু অদ্ভূত প্রকৃতির জন্তু জানওয়ারও দেখা যায়।শুধু জন্তু জানওয়ার বা অশ্বারোহী নয়, মন্দির গাত্রে টেরাকোটার এই কৌণিক ভাস্কর্য অলঙ্করণে স্থান পেয়েছে কালী বা দূর্গা মূর্তি বা যুদ্ধরতা নারী মূর্তি,  ইত্যাদি বিষয়ক প্রসঙ্গও।  এছাড়া কিছু কিছু ক্ষেত্রে মৃত্যুলতায় মিথুন-ভাস্কর্যের উপস্থিতিও লক্ষ্য করা যায়।

বাংলার মন্দির গাত্রে কৌনিক ভাস্কর্যের এই উৎকৃষ্ট নিদর্শনের পেছনে তৎকালীন শিল্পীদের কি মৌলিক চিন্তা ভাবনা ছিল তা আজ অজানা। সমযের বিবর্তনে বাংলার এইরকম বহু ঐতিহাসিক নিদর্শন আজ অবক্ষয়ের পথে। বাংলার মন্দির গাত্রে এই সকল নিদর্শনের মৌলিক তাৎপর্যের গবেষণা যদি আজ না হয় তা হলে কালের অবক্ষয়ে এই ইতিহাস বা সূত্র মুছে যাবে একদিন চিরতরের জন্য। তারাপদ বাবু যথার্থই বলেছেন "সামাজিক বিবর্তনের নানা পর্যায় ও স্তরের যে সাক্ষ্য এইসব প্রতীক মূলক নিদর্শনের মধ্যে আত্মগোপন করে আছে তার পূর্ণ পরিচয় পেতে গেলে প্রথানুগত শিল্প প্রবাহের বিবর্তন সম্পর্কে সন্ধান ও সংগ্রহের একান্তই প্রয়োজন।" 

-পার্থ সান্যাল
সুত্র : পশ্চিমবঙ্গের মন্দির টেরাকোটা, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ

No comments:

Post a Comment